নিজের অজান্তেই একজন যোদ্ধা হয়ে গেলাম
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বীরবিক্রম
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। আমি তখন মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক, এসডিও। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শোনার জন্য মেহেরপুর থেকে ঢাকায় আসি। চুপিসারে টিএসসির এক কোনায় লুকিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনি। কারণ, পাকিস্তানি গোয়েন্দারা দেখে ফেললে সমস্যা হবে। রেসকোর্স ময়দানে তখন লাখ লাখ মানুষ। শুনেছিলাম, সমাবেশে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে বোমা হামলা চালাবে পাকিস্তানি আর্মিরা। সমাবেশ চলাকালে মাথার ওপর দিয়ে কয়েকটা বিমানেরও মহড়া দিতে দেখলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সমাবেশে কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণার সবই বলে দিলেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমারও বুঝতে আর কিছু বাকি রইল না।

বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। দেশ চলছিল তখন বঙ্গবন্ধুর কথায়। সবকিছুর কর্তৃত্ব ছিল তার হাতে। কার্যত বাংলাদেশ তখন স্বাধীন। যাকে বলা হয় ডিফ্যাক্টো অব ইনডিপেনডেন্স। ইতিহাসে দেখা যায়, মহাত্মা গান্ধী স্বাধীনতার জন্য ও মার্টিন লুথার কিং সিভিল রাইটের জন্য অসহযোগ করেছিলেন। কিন্তু তাদের অবদান সীমিত ছিল। বঙ্গবন্ধু এ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন।

যাই হোক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে কর্মস্থল মেহেরপুরে ফিরে গেলাম। এরপর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মতো প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। এলাকার আনসার মুজাহিদদের ডেকে আনলাম। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলাম। মহকুমার অস্ত্রাগার ছিল আমার নিয়ন্ত্রণে। তাদের হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও তাজা গুলি দিলাম।

২৫ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আক্রমণ হলো। খবর পেয়ে আমি বাসা থেকে বের হলাম। দেখলাম, মেহেরপুর চৌরাস্তার মোড়ে সংগ্রাম পরিষদের ছাত্ররা একত্রিত হয়েছে। আমি মহকুমা প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিলাম। সেখানে একটি টেবিল ছিল। তার ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিলাম। তাদের উজ্জীবিত করলাম।

২৬ মার্চ আমি ভারতের কাছে খোলাচিঠি লিখলাম। বললাম, ঢাকায় আক্রমণ হয়েছে। আমাদের অস্ত্র ও গোলা-বারুদ দিয়ে সাহায্য করো। আমাকে দেখা করতে বললেন বেতাই বিওপি-তে। সেখানে আমাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হলো। একটু অবাকই হলাম। তারা আমাকে বললেন, ভারতে তুমিই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত। সেই খোলাচিঠি ভারতের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে আয়োজক, সংগঠক ও সমন্বয়ক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য হয়েছিল। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠান করা হয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, আম্রকাননে। একটু পেছন থেকে বলি। একদিন আমার ছেলেবেলার বন্ধু মাহবুব (ঝিনাইদহের এসডিপিও) এলো। আমাকে বললো, বাইরে আয়, কথা আছে। গেলাম। জিপের মধ্যে দেখলাম দুই ব্যক্তি বসা। লুঙ্গি পরা। পরিচয় করিয়ে দিলেন- তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। দেখে চেনা যায় না। আসলে তারা ছিলেন ছদ্মবেশে। আমি তাদের ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলাম। নেতাদের পাওয়ার পর ভারত আমাদের অস্ত্র ও গোলা-বারুদ দিতে শুরু করল।

১৫ এপ্রিল খবর এলো, বৈদ্যনাথতলায় একটা আয়োজন করতে হবে। মাহবুবসহ গেলাম। আনসার মুজাহিদদের প্রস্তুতি নিতে বললাম। বিএসএফও এলো। তারা নিরাপত্তা দেবে। আমবাগানে হলে নিরাপদ হবে। পাকিস্তানি আর্মিরা ওপর থেকে এখানে হামলা করতে পারবে না। ভারত থেকে মামুলি কিছু ফার্নিচার এলো। সবাইকে বললাম একটা অনুষ্ঠান হবে। ১৭ এপ্রিল ১০টার দিকে মাহবুবসহ পৌঁছালাম। প্রচুর উৎসুক মানুষ। গাছের ডালেও অনেকে বসা। এলো গাড়ির বহর। ইউসুফ আলী (তিনি পরে মন্ত্রী হয়েছিলেন) স্বাধীনতার ঘোষণা ও শপথ পাঠ করালেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো। পরিবেশিত হলো জাতীয় সংগীত। গার্ড অব অনার দেওয়া হলো। আনসার মুজাহিদরাই গার্ড অব অনার দিল। নেতৃত্ব দিল মাহবুব। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো আছেনই। উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তিনিই অস্থায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এভাবে ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে সেদিন বলেছিলেন, তৌফিক, তুমি শুধু সাক্ষী না, ইউ আর পার্ট অব হিস্ট্রি।

আমাদের ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর ওসমান। তিনি ছিলেন চুয়াডাঙ্গায়। তিনি ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরীকে নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন কুষ্টিয়া মুক্ত করতে। কুষ্টিয়া পাকিস্তানি আর্মিদের দখলে। আমার বন্ধু মাহবুব ঝিনাইদহের সংগ্রাম পরিষদের ছেলেদের নিয়ে এক রকম প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এদিকে মেহেরপুর ও আলমডাঙ্গার ছেলেরাও যুক্ত হলো। সবাই মিলে কুষ্টিয়া যুদ্ধে আমরা অংশ নিলাম। পরিকল্পনা করা হলো, হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের আতঙ্কিত করে ফেলা হবে। কারণ, ওদের চেয়ে আমাদের সামরিক শক্তি কম। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি আর্মি লেফটেন্যান্ট আতাউল্লাহ ছাড়া আর সবাই নিহত হয়েছিল। পাকিস্তানি আর্মিরা অনেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এখান থেকে পাকিস্তানি আর্মির ৩০টা গাড়িভর্তি অস্ত্র পেলাম। এগুলো নিয়ে চুয়াডাঙ্গা ফেরত এলাম। যখন এই গাড়ির বহরে ছিলাম তখন পাকিস্তানি আর্মিরা আকস্মিক বিমান হামলা শুরু করল। বোমা ফেলল। কিন্তু বেঁচে গেলাম।

এটা কোনো কনভেনশনাল যুদ্ধ ছিল না। এটা একটা জনযুদ্ধ। আমি যখন সাবসেক্টর কমান্ডার হই তখন আমার অধীনে চার হাজার গেরিলা যোদ্ধা ছিল। আর মাত্র দুশ নিয়মিত যোদ্ধা। এ রকম সারাদেশে হাজার হাজার গেরিলা যোদ্ধা ছিল। নিজের অজান্তে সিভিলিয়ান থেকে আর্মি যোদ্ধা হয়ে গিয়েছিলাম। ইপিআর সদস্যরা আমাকে স্যাবেরনের ক্যাপ্টেন ড্রেস পরিয়ে তাদের মধ্যে গ্রহণ করেছিল যুদ্ধের মাঝামাঝি। আমি তখন সাবসেক্টর কামান্ডার। পেট্রাপোলে কোম্পানি কমান্ডার। যশোর সীমান্তে পুটখালী নামে একটি বিওপি ছিল। সেখানে শত্রুর ওপর অতর্কিত হামলা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঝটিকা আক্রমণ। ভোরেরও আগে এ ধরনের আক্রমণ করতে হয়। কারণ, এ সময় সবাই অঘোরে ঘুমায়। এখানে আমাদের পথ দেখায় তিনজন ডাকাত। কিন্তু পৌঁছতে সকাল হয়ে গেল। তারপরও আক্রমণ করলাম। প্রথমে ওদের ওয়াচ টাওয়ারে গুলি করা হলো। কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ তুমুল সংঘর্ষ চলল। এখানে আমাদের সঙ্গে রোস্তম নামে এক সাহসী যোদ্ধা ছিল। গোলা-বারুদ উদ্ধার করতে সে ওদের একটি বাঙ্কারের কাছে গেল। তখন পাকিস্তানি আর্মিদের গুলিতে তার বুক ঝাঁজরা হয়ে গেল। আমরা কয়েকজন ওর লাশটা আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এই যুদ্ধের জন্য আমাকে বীরবিক্রম খেতাব দেওয়া হয়। এটা দুঃসাহসিক গেরিলা যুদ্ধ ছিল।

আমার অধীনে মেহেরপুর ট্রেজারিতে প্রায় ৪ কোটি টাকা ছিল। এ ছাড়া নড়াইল, যশোরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আরও প্রায় ৫০ লাখ টাকা আনা হলো। এসব টাকা আমাদের বিভিন্ন ব্যাংকে ছিল। পাকিস্তানি আর্মিরা এগুলো তখনও নিতে পারেনি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই টাকা সরকারের হাতে তুলে দেব। তিন ট্রাক টাকা হলো। ১ টাকার নোট সব জনগণকে দিয়ে দিলাম। কারণ, এগুলো বহন করার সুযোগ ছিল সীমিত। রাস্তা সব বন্ধ। ট্রাকে কী আছে কেউ জানে না। দড়ি বেঁধে ক্ষেত-খামার দিয়ে ট্রাক টেনে নিয়ে ওপারে যাই। জনগণ সাহায্য করে। ভারতে গিয়ে এক ব্যাংকে গেলাম। তারা বললো, তাদের ভল্টে এত টাকা রাখার জায়গা নেই। পেট্রাপোলে একটা ঘরে টাকাগুলো রাখলাম। পরে টাকা নিয়ে কলকাতায় জমা দিলাম আমাদের সরকারের কাছে। প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। একুশ কেজি সোনার গহনাও ছিল।

আমাদের চাওয়া ছিল স্বাধীন একটি দেশ। পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু যখন দায়িত্ব নেন তখন এ ভূখণ্ড একটা শ্মশান ছিল। ‘৭৫ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে পাকিস্তানের চেয়ে বেশি ছিল। এরপর মাথাপিছু আয় কমতে থাকে। ১৩ বছর পর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সেই ‘৭৫ সালের সমান হয়। এটাই হলো বাস্তবতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। এ ভালোবাসা থেকেই বঙ্গবন্ধু যখন প্রাদেশিক সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তার দূরদর্শিতায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন প্রতিষ্ঠার বিল আনা হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের বাংলাদেশে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি)।

সিনেমা অঙ্গনকে ভালোবেসে এদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নে আমৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও সিনেমাতে অভিনয় করেছেন। বঙ্গবন্ধু অভিনীত সিনেমাটির নাম ‘সংগ্রাম’। ছবিটি পরিচালনা করেন প্রয়াত নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র ‘সংগ্রাম’। এতে ছোট্ট এক ভূমিকায় হাজির হয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালি। সে সময়ের চিত্রনায়ক কামরুল আলম খান খসরু ও চাষী নজরুল ইসলামের অনুরোধে ছোট্ট ওই চরিত্রে অভিনয়ে রাজি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ছবির চিত্রনাট্যের শেষ দিকে ছিল, মুক্তিযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন দেশের সামরিক বাহিনী বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে স্যালুট করছে। এই দৃশ্য কীভাবে ধারণ করা যায় সে নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। একপ্রকার দুঃসাহস নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন ছবিটির নায়ক খসরু। কিন্তু বঙ্গবন্ধু প্রথমে রাজি হননি। পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নানকে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে অভিনয়ের জন্য তাকে রাজি করানো হয়।

‘সংগ্রাম’ ছবিটিতে নাযক ছিলেন খসরু আর নায়িকা সূচন্দা। ছবিটি ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায়।

বঙ্গবন্ধু যে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন